রবিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২১ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নাভিশ্বাসে জনজীবন!

সামছুল আলম সাদ্দাম
১১ নভেম্বর ২০২১ ১১:৪৭ |আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২১ ১৮:২৩
সামছুল আলম সাদ্দাম। লেখক ও সাংবাদিক
সামছুল আলম সাদ্দাম। লেখক ও সাংবাদিক

করোনার থাবায় টালমাটাল গোটা বিশ্ব, যার পরিপূর্ণ প্রভাব পড়েছে কমবেশি প্রায় প্রতিটি সেক্টরে। বিশেষ করে অর্থনীতিতে যার প্রভাব বেশ লক্ষণীয়। করোনার প্রভাবে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। চালের পাশাপাশি ডাল, আটা, চিনি, তরকারি, মাছ, মাংসসহ অধিকাংশ পণ্যের দাম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দরিদ্র, খেটে খাওয়া ও অসহায় মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে। বিশেষ করে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ চরমে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কৃষকপর্যায়ে এসব পণ্যর মূল্য কেমন? মজার বিষয় হচ্ছে কৃষকপর্যায়ে সবজি অর্থাৎ পচনশীল পণ্যের মূল্য দুইয়ের ঘর পার হতে পারে না। অর্থাৎ বেশিরভাগ পণ্যের মূল্য ১০ টাকার বেশি নয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃষককে পুঁজি উঠাতে হিমশিম খেতে হয়। এর একটি বড় কারণ রয়েছে কৃষকপর্যায়ে কোনো হিমাগার না থাকায় কৃষকদের অনেকটা বাধ্য হয়ে পণ্য কম দামে ছেড়ে দিতে হয়। যেহেতু মৌসুমি ফসলগুলো সবার একসঙ্গে আসে তাই মৌসুমে পণ্যের দাম থাকে খুব কম। অথচ বড় ব্যবসায়ীরা অধিক পরিমাণ পণ্য হিমাগারে সংরক্ষণ করে মৌসুম শেষ হওয়ার পর অধিক দামে বিক্রি করে। ফলে দেখা যায় ফসল উৎপাদন করা কৃষকরা তাদের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয় অথচ ব্যবসায়ীরা হয় লাভবান। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে কৃষকদের অবস্থা কতটা শোচনীয়। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে খাদ্য উৎপাদন করে প্রাপ্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়। অথচ মুনাফা লোভী কিছু বিপথগামী ব্যবসায়ী কৃষকদের বঞ্চিত করে নিজেরা অধিক অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

সম্প্রতি টেলিভিশনে একটি প্রতিবেদন লক্ষ্য করলাম। প্রতিবেদক খুব সুন্দরভাবে দেখানোর চেষ্টা করলেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবোঝাই ট্রাকের রাতের চিত্র। প্রতিটি স্তরে কমিশন দিনে ট্রাককে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। টাকা না দিলে ট্রাক ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে যখন পণ্য পরিবহনে অধিক অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে তাই ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই ওই অর্থ সাধারণ মানুষের ওপর চাপায়। ফলে দ্রব্যমূল্যে বেড়ে হয়ে যায় দ্বিগুণ। অনেক ক্ষেত্রে তিনগুণ বা তারও বেশি। তা ছাড়া ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট তো রয়েছেই। প্রতিনিয়ত কিছু মুনাফা লোভী ব্যবসায়ী টাকার লোভে পণ্যর কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা।

প্রশাসন থেকে বাজার তদারকির ব্যবস্থা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে চরম প্রতারণা করছে। সরকারকে এই ব্যাপারে নজর দিতে হবে। সরকারকে অসাধু ও অধিক মুনাফা লোভী ব্যবসায়ীদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাজারে মনিটরিং বাড়ানো, ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেসব ব্যবসায়ী অসৎ ও অনৈতিকভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ায় তাদের কাছ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শুধু জরিমানা আদায় নয়, তাদের ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থাও নিতে হবে। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে।

বাজারে দোকানের সামনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যতালিকা টানিয়ে রাখতে হবে। জনগণকেও সচেতন হতে হবে এবং দায়িত্বশীলতার পরিচিত দিতে হবে। কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রয় করলে সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের দ্বারস্থ হতে হবে এবং প্রশাসনকে এ ব্যাপারে জোর তৎপরতা চালাতে হবে। এসবের পাশাপাশি বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ ও সরবরাহ বাড়াতে হবে, যাতে করে কোনো ধরনের সঙ্কট সৃষ্টি না হয়। ব্যবসায়ী সমাজকে অসাধুতা এবং অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশা পরিহার করে সঠিক ও সুন্দরভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে।

সরকারের কঠোরতা এবং ব্যবসায়ীদের সচেতনতা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে ন্যায্যমূল্যে টিসিবির পণ্য সাধারণ মানুষের মাঝে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

এতে কিছুটা হলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে। কিন্তু টিসিবির পণ্য সর্বদাই শহরমুখী। গ্রামীণপর্যায়ে যার কোনো পদচারণা নেই বললেই চলে। অথচ বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের বেশিরভাগ গ্রামে বাস করে। তাই গ্রামীণপর্যায়ে টিসিবির পণ্য সরবরাহ করা প্রয়োজন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যদি নাগালের মধ্যে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হ্রাস পাবে। তাই সাধারণ মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সুলভ মূল্যে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সরকার তথা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

লেখক : সামছুল আলম সাদ্দাম

লেখক ও সাংবাদিক



মন্তব্য করুন