শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৯ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আপনার বিরুদ্ধেও হতে পারে হত্যা মামলা!

সৈয়দ বোরহান কবীর
৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২৩:০৮ | আপডেট : ৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৭:৩৭
সৈয়দ বোরহান কবীর
সৈয়দ বোরহান কবীর

আপনি নির্বিবাদী, কাজপাগল মানুষ। কারো সাতেপাঁচে নেই। কিন্তু এক সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনার চোখ চড়কগাছ। একটি হত্যা মামলায় আপনি আসামি। যিনি মারা গেছেন, তাকে আপনি চেনেন-ও না। তবুও আপনি আসামি। আপনি কিছুটা বিরক্ত হলেন, কিছুটা উদ্বিগ্নও বটে। পরিচিত কাউকে দিয়ে মামলার কপি তুললেন। আপনি যেন একটা বিস্ময়ের জগতে। এই হত্যাকাণ্ডে আপনার সম্পর্ক খুঁজতে খুঁজতে আপনি ক্লান্ত। তাতে কি? মিডিয়া বিশেষ করে সামাজিক মিডিয়ায় আপনাকে নিয়ে হুলস্থুল শুরু হলো।

সোশাল মিডিয়া আপনার গায়ের চামড়া ছিঁড়ে লবণ লাগাতে লাগল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই সোশাল মিডিয়ায় আপনি হয়ে গেলেন খুনী, হত্যাকারী, ঘাতক। বিচার দরকার নেই, তদন্ত দরকার নেই আপনি 'খুনী', অন্তত এক শ্রেণির অতি-উৎসাহী মিডিয়ার কাছে। এরপর ওই মামলা নিয়ে শুরু হলো তদন্ত, দৌড়ঝাঁপ। আপনি কি কাজ করবেন, ব্যবসা চুলোয় গেল। তদন্ত কর্মকর্তা আপনাকে জিজ্ঞেস করবে, ভাই আমি তো সব জানি। ঘটনার আশপাশে আপনি ছিলেন না। আপনি এই সবের বিন্দুবিসর্গও জানেন না। কিন্তু কি করব, কোর্ট তো আমাকে তদন্ত করতে বলেছেন, তদন্ত না করলে তো সমস্যা। আবার আপনার সাথে কথা না বললে ফেসবুকে লিখবে, তদন্ত কর্মকর্তা ম্যানেজ। কিছুক্ষণ খোশগল্প করে তদন্ত কর্মকর্তা চলে গেল। এদিকে দিন যায়, মাস যায়। আপনি বেকুব হয়ে বসে আছৈন। অবশেষে একদিন রিপোর্ট দিল, না এটি হত্যা নয়, স্বাভাবিক মৃত্যু। আপনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। কিন্তু আসলে বাঁচলেন কি? এরপর ইউটিউবে, ফেসবুকে আপনাকে কচলানো শুরু হলো। কোনো কিছু না করেও আপনি কিছুদিন আসামির জীবন যাপন করলেন। দু-একটা মিডিয়া আপনার বিচার করে ফেলল। আপনার ওপর যে তীব্র মানসিক অত্যাচার, আপনার যে সম্মানহানি- তার বিচার কে করবে?

পাঠক, এটি কল্পিত কোনো গল্প নয়। এ রকম পরিস্থিতি হতে পারে আপনার জীবনেও। প্রমাণ দরকার নেই, মামলা করেই অর্ধেক বিচার করা সম্ভব এখন এই দেশে। ফেসবুক, ইউটিউব পেল ভিউ, লাইকের খাদ্য। কিভাবে? দেখুন না, গত ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ৮ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের মামলাটি। মুনিয়া মারা গেছে ১৯ এপ্রিল। প্রথম মুনিয়ার বোন মামলা করলেন, আত্মহত্যা প্ররোচনার। এই মামলায় তিনি একজনকে অভিযুক্ত করলেন। তিনি একজন বিখ্যাত মানুষ। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ বসুন্ধরার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ব্যস, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হলো হৈচৈ, হুলস্থুল। সবাই যেন বিচারক। পারলে এখনই বসুন্ধরার এমডিকে ফাঁসি দেয়। একটু খোঁজ নিলেই দেখবেন যারা মিডিয়া ট্রায়াল করছে এরা তো সবাই যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার গোষ্ঠী। মুহূর্তে বুঝবেন মুনিয়ার বিচার নয়, এটা সরকারকে বিপদে ফেলতে চায়। একটি কিশোরীর লাশকে ঘিরে শুরু হলো ষড়যন্ত্রের পৈশাচিক নৃত্য। শেষ পর্যন্ত ওই মামলা নিষ্পত্তি হলো। কিন্তু তিনটা মাস একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে কুৎসিত নোংরা খেলা হলো তার বিচার কে করবে?

নাটকের শেষ এখানেই নয়। ৬ সেপ্টেম্বর মুনিয়ার বোন একই বিষয়ে ধর্ষণ এবং হত্যা মামলা করলেন। আত্মহত্যা হয়ে গেল হত্যাকাণ্ড। এবার আসামি করা হলো আটজনকে। এদের মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যানও আছেন। মুনিয়ার মৃত্যুর সাথে তার সম্পর্ক কি, এটা খুঁজতে খুঁজতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বিচার করা হচ্ছে। আবার সেই যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার। আশ্চর্য এবং দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো এই মামলায় পাঁচজন নারীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ধর্ষণের মামলায় নারী আসামি। কি অদ্ভুত।

বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক মামলা করতেই পারেন। কিন্তু আদালতকে অবশ্যই একটি মামলা তদন্তে দেওয়ার আগে তার মেরিট দেখতে হবে। যাকে আইনের ভাষায় বলা হয় 'প্রাইমা ফেসিয়া কেস'। আদালত যদি কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই যেকোনো মামলা আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয়, তাহলে প্রতিহিংসা এবং ব্লাকমেইলিং এর এক সর্বনাশের খেলা শুরু হবে। কালকে আপনার ওপর রাগ করে, কোর্টে গিয়ে আপনার বিরুদ্ধে ঠুকে দেবে মামলা। এরপর মিডিয়া ট্রায়ালে আপনি বিচার তদন্তের আগেই ক্ষতবিক্ষত হবেন। লঙ্ঘিত হবে সংবিধান।

আমাদের সংবিধানের ২৭ ধারায় বলা হয়েছে 'সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী'। আদালত হয়তো স্রেফ আনুষ্ঠানিকতার জন্যই মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আদালতের আনুষ্ঠানিকতা কিছু মানুষকে যে কি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে পারে তা কি কেউ ভেবেছে? আদালতের আনুষ্ঠানিকতা একটি গোষ্ঠীর কাছে চরিত্রহননের অস্ত্র তুলে দেওয়া। এই মামলার সূত্র ধরে কাউকে বিপদে ফেলতে একটা মামলা করে, সোশাল মিডিয়াতে গল্প ছড়ালেই হলো। বিচার লাগবে না। এখন এই মামলার উদাহরণ টেনে যদি, জামায়াত-যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী বিভিন্ন কথিত গুমের অভিযোগকে হত্যাকাণ্ড বলে মামলা করে, আর এগুলো যদি তথাকথিত তদন্তে পাঠানো নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন কি সরকার একটা অস্বস্তিতে পড়বে না? এই মামলার দেখানো পথে যদি দেশের ১০টি প্রধান শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী, যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী মামলা করে তাদের হয়রানি করে, তাহলে কি অর্থনীতির চাকা থমকে যাবে না?

সবচেয়ে বড় কথা এই মামলা কি মিডিয়া ট্রায়ালের (নাকি সোশাল মিডিয়া) পথ উন্মুক্ত করে দিলো না। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী যার বিরুদ্ধে অসহায় বলে নিজেই কবুল করেছেন।



মন্তব্য করুন