রবিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২১ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আমরা কি জানি মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদান?

রাফিয়া মাহমুদ প্রাত
২৭ ডিসেম্বর ২০২০ ১০:৫৭ |আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২১ ০০:০০
মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ ছবিসূত্র : noakhali.police.gov.bd
মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ ছবিসূত্র : noakhali.police.gov.bd

আমরা হয়তো অনেকেই জানি না ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে হানাদার বাহিনীরা যখন আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই রাতে প্রথম হামলা চালানো হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। কিন্তু একজন পুলিশও সেদিন ভয়ে মাথা নত করেনি। অকুতোভয় পুলিশ সদস্যরা সেদিন নির্ভিকচিত্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে হানাদার বাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে।

অপারেশন সার্চলাইট নামে খ্যাত এই বীভৎস রাতের জন্য পাকিস্তানিরা পূর্ব থেকেই তাদের নীল নকশা এঁকেছিল। প্রতিদিন অসংখ্য সেনাবাহিনী, অস্ত্র-শস্ত্র আসতো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। অথচ এ দেশের মানুষ কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি।

আর ঠিক এরকম একটি ভয়ালো রাতেই আমাদের অকুতোভয় পুলিশ বাহিনী কাপুরুষের মতো পিছু না হটে যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত বাতিল ৩০৩ রাইফেল দিয়ে সেদিন বীরসন্তানরা হানাদার বাহিনীর বিপরীতে তীব্র প্রতিরোধ তুলে ধরেছিল। পাক বাহিনীর ভারী অস্ত্রের গোলায় সেদিন ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল সবকটি পুলিশ ব্যারাক। শহীদের অমিয় সুধা পান করেছিলেন অসংখ্য নির্ভিক দেশপ্রেমিক।

তৎকালীন রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্যারেডরত পুলিশ; ছবি : ডয়চে ভেলে

সেই ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ ওয়ারলেস অপারেটর হিসেবে যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিয়া ছিলেন অন্যতম।

এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাতকারে শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে হামলার পর পুলিশ সদস্যরাও পাক হানাদার বাহিনীকে লক্ষ্য করে থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে গুলি করে আক্রমণের পাল্টা জবাব দেন। পাল্টা আক্রমণে হতভম্ব হয়ে পড়ে পাক বাহিনী। পরে আরও শক্তি নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে। এতে অনেকেই সেই রাতে ও পরের দিন শহীদ হন।’

তিনি বলেন, ‘পাক বাহিনী যখন হামলা চালায়, তখন রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টা। হামলা চালানোর সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি পুলিশ সদস্যরাও পাল্টা আক্রমণ করে।’ কাল বিলম্ব না করে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সকল বিভাগ ও জেলা শহরের পুলিশ স্টেশনগুলোতে একটি মেসেজ পাঠিয়ে দেন।

বার্তাটি ছিলো এরূপ-

Base for all station of East Pakistan police, keep listening, watch, we are already attacked by the pak army. Try to save yourself, over.

কিন্তু শত্রুর নৃশংস ছোবল থেকে রক্ষা পাননি শাহজাহান মিয়া। পরদিন ২৬ মার্চ ভোর পাঁচটার দিকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পাকবাহিনীর ক্যাম্পে। সেখানে তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন।

শাহজাহান মিয়া; ছবি : সংগৃহীত

শাহজাহান মিয়া আরও জানান, ‘রাত ১২টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর মর্টার ও হেভি মেশিনগানের গুলি বর্ষণের সামনে বাঙালি পুলিশদের আমৃত্যু লড়াই শেষ পর্যন্ত আর টিকে থাকতে পারেনি। প্রায় ৮০০ সদস্য ট্যাংক বহরসহ প্যারেড মাঠে ঢুকে পড়। আর আমাদের অসংখ্য বীর পুলিশদের রক্তে রক্তাক্ত হয় পাক সেনাদের হাত!’

মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর অবদান বিষয়ে নিয়োজিত কর্মকর্তারা জানান, ২৫ মার্চ দুপুর ২টার পর থেকেই পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা নানা ধরনের গোয়েন্দা তথ্য পেতে থাকেন। এরপরই কন্ট্রোল রুম থেকে শহরের বিভিন্নস্থানে পুলিশের টহল টিম পাঠানো হয়। বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে পুলিশ বাহিনী শহরের থমথমে পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে খবর দিতে শুরু করে।

রাত ১০টার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে পুলিশের একটি টহল টিম বেতার মারফত জানায়, শহরের দিকে বিশাল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসছে পাকবাহিনীর একটি বড় ফোর্স। রাত যখন সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে তখন খবর আসে, তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান ও বর্তমানে রমনা পার্কের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সেনাবাহিনীর বেশ কিছু সাঁজোয়া যান অপেক্ষা করছে। এসব খবর পেয়ে রাজারবাগের বাঙালি পুলিশ সদস্যরা যে যার মতো প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে থাকেন। 

শুধু তাই নয়, সেদিন রাত ১১.৩৫ মিনিটে ঘণ্টা পিটিয়ে সবাইকে সতর্ক এবং একত্রিত করেন রাজারবাগ পুলিশ সদস্যরা। অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে নিজেদের মধ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিতরণ করে যুদ্ধে প্রস্তুতি হিসেবে পুলিশ লাইনের চারিদিকে, ব্যারাকে, দালানের ছাদের অবস্থান নেন তারা।

রাজারবাগসহ দেশের বিভিন্নস্থানে প্রায় ১৪ হাজার পুলিশ সদস্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের দলিল অনুযায়ী ১২৬২ জন পুলিশ সদস্য দেশের জন্য, দেশের পতাকার জন্য জীবন দিয়েছেন।

এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও এখানে জেলাভিত্তিক পুলিশদের আনুমানিক সংখ্যা তুলে ধরা হলো।

ঢাকা

৫০ জন

কুষ্টিয়া

৩৩ জন

রাজশাহী

৬০ জন

ফরিদপুর

৪ জন

রিজার্ভ পুলিশ

১৪০ জন

সিলেট

১৩ জন

ময়মনসিংহ

২৩ জন

এআইজি টেলিকম ঢাকা অফিস

৭ জন

রংপুর

২৩ জন

টাঙ্গাইল

 

দুর্নীতি দমন সংস্থা

৩ জন

বগুড়া

২১ জন

চট্টগ্রাম

৭১ জন

বরিশাল

১৪ জন

পাবনা

৩০ জন

পার্বত্য চট্টগ্রাম

২৩ জন

রাজশাহী রেঞ্জ অফিস

৩ জন

দিনাজপুর

২১ জন

 কুমিল্লা

 

সিআইডি

২ জন

পটুয়াখালি

৬ জন

নোয়াখালি

৯ জন

সারদা পুলিশ একাডেমি

৩৯ জন

খুলনা

৭০ জন

ওয়ারলেস অপারেটর শাহজাহান মিয়া, অস্ত্রাগারের দায়িত্বরত পুলিশ কনস্টেবল আবু শামা এবং আব্দুল আলী, যিনি তৎকালীন আইজি তসলিম উদ্দিনের দেহরক্ষক ছিলেন; তারা তিনজনই ডয়চে ভেলেকে জানান, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পরই ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি চলছিল। আর রাত ৯টার পরেই খবর আসে, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ হতে পারে। 

শাহজাহান মিয়া তার তিন ভাইকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ছিলেন ৯ নম্বর সেক্টরে। ৩ নম্বর সেক্টরে ছিলেন আবু শামা। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে গুরুতরভাবে আহত হন তিনি। আর মেঘালয়ে  প্রথমে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন আবদুল আলি। এরপর ময়মনসিংহ এলাকা থেকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তবে স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল আব্দুল আলিকে। ২৫ মার্চ রাতে অস্ত্রাগার ভাঙ্গাসহ আরও কিছু অপরাধে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে চাকরিচ্যুতির শর্তে তিনি প্রাণভিক্ষা পান। 

মূলত, ৭১ সালের মার্চ মাস থেকেই প্রাদেশিক পুলিশদের উপর থেকে কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছিল তৎকালীন সরকার। ফলে প্রকাশ্যেই তারা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পেরেছিলেন। এরপর দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধে দেশব্যাপী গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনেন তারা। 

ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতার আগে পুলিশ বাহিনীর নাম ছিল ইষ্ট-বেঙ্গল পুলিশ, পরবর্তীকালে তা ইষ্ট-পাকিস্তান পুলিশ এবং স্বাধীনতার পর বর্তমানে তা বাংলাদেশ পুলিশ নামে সংগঠিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদান নিয়ে ‘শহীদ পুলিশের রক্তের ঋণ’ নামের একটি বই লেখেন এআইজি আবিদা সুলতানা। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পুলিশের অবদান নিয়ে হাবিবুর রহমান দুটি খণ্ডে বই লিখেছেন।

আর তাদের আত্মত্যাগ ও কৃতিত্ব নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করছেন মির্জা সাখাওয়াত হোসেন। সিনেমাটির নাম ‘অর্জন-৭১। ছবি : সংগৃহীত

যাকে নিয়ে সিনেমার কাহিনি রচিত তিনি ছিলেন পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস আই আব্দুল কাদের মিয়া। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা এই এসআই পুলিশের নেতৃত্বেই ৭১ সালের ২৭ মার্চ দেবীগঞ্জ থানা এবং আনসার ক্লাবের সামনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। 

পরিচালক সাখাওয়াত বলেন, মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর অংশগ্রহণ, রাজারবাগ আক্রমণ ও প্রতিরোধ যুদ্ধ,সারদা পুলিশ একাডেমিতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ,মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারকে পুলিশের নেতৃত্বে গার্ড অব অনার দেওয়া এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ আব্দুল কাদের মিয়ার আত্মত্যাগ সব নিয়েই সিনেমার চিত্রনাট্য সাজানো হয়েছে।

সিনেমায় কাদের মিয়ার চরিত্রে শতাব্দী ওয়াদুদ এবং তার স্ত্রীর চরিত্রে চিত্রনায়িকা মৌসুমীকে আমরা দেখতে পাবো।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রথম বুলেট ছুড়েছিল পুলিশ। ২৫ মার্চের রাত সাড়ে ১১টায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গাড়ি বহর পুলিশ লাইন্সে হামলা চালানোর জন্য শান্তিনগর মোড়ে পৌঁছানো মাত্রই পাশের ডন স্কুলের (বর্তমানে ইস্টার্ন শপিং মল) ছাদ  থেকে ওই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন সৈনিককে লক্ষ্য করে প্রথম বুলেটটি ছোড়েন একজন বাঙালি পুলিশ সদস্য। থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে ছোড়া লক্ষ্যভেদী ওই বুলেটে পাকিস্তানি ওই সৈনিক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য খেতাব পাওয়া পুলিশ সদস্যের সংখ্যা কম। এমনকি খেতাবের জন্য পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আবেদন করার আগ্রহও ছিল কম।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী একে এম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘যুদ্ধের পরে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের তালিকা তৈরি করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। যারা ফর্ম পূরণ করেছেন তাদের তালিকাভূক্ত করা হয়েছিল। কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি।’